আপনি কি জানেন যে আপনার কিছু অভ্যাস বা শারীরিক অবস্থা ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে? অনেকেই এই রোগটি সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন না। ফলে, অজান্তেই তারা ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। এই রোগটি যে কারও হতে পারে, তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এর সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কাদের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি এবং কীভাবে সতর্ক থাকা যায়।
যাদের পরিবারে ডায়াবেটিস আছে, ওজন অতিরিক্ত, বা অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করেন, তাদের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেশি। শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, বয়স ৪৫-এর বেশি হওয়া, এবং উচ্চ রক্তচাপও ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। স্বাস্থ্যকর খাবার ও নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
এখন আমরা এই ঝুঁকিগুলোকে এক এক করে আরও বিস্তারিত জানবো। প্রতিটা কারণ কীভাবে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়, তা পরিষ্কারভাবে জানবো। এতে আপনি নিজের বা পরিবারের কারও জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবেন।
আপনার পরিবারে বাবা-মা বা ভাই-বোনের মতো নিকটাত্মীয়ের ডায়াবেটিস থাকলে, আপনারও এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এটি মূলত জিনগত কারণে হয়, কারণ কিছু জিন আপনাকে ডায়াবেটিসের প্রতি বেশি সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। পারিবারিক ইতিহাস থাকলে আগে থেকেই জীবনযাত্রা নিয়ে সতর্ক হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
জিনগত ঝুঁকি মানেই যে আপনার ডায়াবেটিস হবেই, তা কিন্তু নয়। তবে এটি একটি সতর্কবার্তা। আপনার মা-বাবা দুজনেরই টাইপ ২ ডায়াবেটিস থাকলে আপনার ঝুঁকি প্রায় ৫০% বেড়ে যেতে পারে। একজনের থাকলে ঝুঁকি কিছুটা কম থাকে। তাই পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস জানলে স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আপনি এই ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারেন।
শরীরের অতিরিক্ত ওজন ডায়াবেটিসের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি। আপনার ওজন বাড়লে শরীরে ইনসুলিন প্রতিরোধের (insulin resistance) সৃষ্টি হয়। এর মানে হলো, শরীর ইনসুলিন তৈরি করলেও কোষগুলো তা ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না। ফলে রক্তে চিনির মাত্রা বাড়তে থাকে, যা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের পথ তৈরি করে।
ওজন বাড়ার সাথে সাথে, বিশেষ করে পেটের চারপাশে চর্বি জমলে, শরীর থেকে কিছু রাসায়নিক পদার্থ বের হয়। এই পদার্থগুলো ইনসুলিনের কাজে বাধা দেয়। আপনার বডি মাস ইনডেক্স (BMI) ২৫-এর বেশি হলে ঝুঁকি বাড়তে শুরু করে। ওজন মাত্র ৫-১০ শতাংশ কমালেও ইনসুলিনের কার্যকারিতা অনেকটাই উন্নত হয়। তাই সঠিক ওজন বজায় রাখা ডায়াবেটিস প্রতিরোধের জন্য খুব জরুরি।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, যেমন- অতিরিক্ত মিষ্টি, প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং ফাস্ট ফুড খাওয়া, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। এই খাবারগুলো রক্তে দ্রুত চিনির মাত্রা বাড়ায়। সময়ের সাথে সাথে, এটি আপনার শরীরের ইনসুলিন ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের কারণ হতে পারে।
প্রক্রিয়াজাত খাবার ও কোমল পানীয়তে প্রচুর পরিমাণে চিনি ও অস্বাস্থ্যকর ফ্যাট থাকে, কিন্তু পুষ্টিগুণ 거의 থাকে না। নিয়মিত এসব খাবার খেলে ওজন বাড়ে এবং শরীর ইনসুলিন প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। এর বিপরীতে, ফল, শাকসবজি ও আঁশযুক্ত শস্য জাতীয় খাবার রক্তে চিনির মাত্রা স্থিতিশীল রাখে। একটি সুষম খাদ্যাভ্যাস শরীরকে সুস্থ রাখে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়।
শারীরিক পরিশ্রমের অভাব বা অলস জীবনযাপন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। আপনি যখন ব্যায়াম বা কায়িক পরিশ্রম করেন না, তখন আপনার শরীরের কোষগুলো ইনসুলিনকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। এর ফলে রক্তে চিনির পরিমাণ বাড়তে থাকে। নিয়মিত সক্রিয় থাকা শরীরকে ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীল রাখে এবং ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সাহায্য করে।
সক্রিয় জীবনযাপন করলে আপনার পেশিগুলো রক্ত থেকে চিনি গ্রহণ করে শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে। এতে অগ্ন্যাশয়ের ওপর চাপ কমে। যারা দিনে ৩০ মিনিটের কম সময় হাঁটেন বা কোনো ধরনের ব্যায়াম করেন না, তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি। লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করা বা কাছাকাছি দূরত্বে হেঁটে যাওয়ার মতো ছোট ছোট পরিবর্তনও আপনার শরীরকে সক্রিয় রাখতে পারে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে পারে।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবেই টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়, বিশেষ করে ৪৫ বছর বয়সের পর। এর কারণ হলো, বয়সের সাথে শরীরের কোষগুলো ইনসুলিনের প্রতি কম সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। এছাড়া, বয়স বাড়লে শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া এবং ওজন বাড়ার প্রবণতাও এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
বয়স বাড়লে আমাদের মাংসপেশীর পরিমাণ কমতে থাকে এবং চর্বির পরিমাণ বাড়ে, যা ইনসুলিনের কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করে। অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন তৈরির ক্ষমতাও কিছুটা কমে যেতে পারে। এই পরিবর্তনগুলোর কারণে শরীর রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হিমশিম খায়। তাই বয়স ৪৫ পেরোলে কোনো লক্ষণ না থাকলেও নিয়মিত ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
উচ্চ রক্তচাপ এবং রক্তে খারাপ কোলেস্টেরলের (LDL) উচ্চ মাত্রা থাকলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়। এই দুটি সমস্যা প্রায়শই ডায়াবেটিসের সাথে একসাথে দেখা যায় এবং এরা একে অপরের ঝুঁকি বাড়ায়। এই অবস্থাগুলো ইনসুলিন প্রতিরোধের সাথে সম্পর্কিত, যা ডায়াবেটিসের মূল কারণগুলোর একটি।
উচ্চ রক্তচাপ রক্তনালীর ক্ষতি করে, যা ইনসুলিনের স্বাভাবিক কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। অন্যদিকে, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল জমলে তা কোষের ইনসুলিন গ্রহণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এই দুটি সমস্যা একসাথে শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে এবং অগ্ন্যাশয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। তাই রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা ডায়াবেটিস প্রতিরোধের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
ডায়াবেটিসের ঝুঁকিগুলো জানা থাকলে আপনি সহজেই সতর্ক হতে পারবেন। পারিবারিক ইতিহাস, অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাবের মতো বিষয়গুলো আপনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এবং উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরল থাকলেও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এই বিষয়গুলো জানা থাকলে আপনি আগে থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
সচেতন থাকাই ডায়াবেটিস প্রতিরোধের প্রথম ধাপ। ঝুঁকিগুলো জেনে আপনি নিজের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেন। স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করুন, যেমন- ফল, শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়াম বা হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলোই আপনার শরীরকে সুস্থ রাখতে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে বড় ভূমিকা পালন করে।
আপনার স্বাস্থ্যের নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতেই। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান, বিশেষ করে যদি আপনার পরিবারে ডায়াবেটিস থাকে বা বয়স ৪৫-এর বেশি হয়। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে আপনি ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারেন। নিজের শরীরের যত্ন নিন, সক্রিয় থাকুন এবং একটি সুস্থ জীবন উপভোগ করুন।